অর্থসংকট ও বরাদ্দ জটিলতায় সাত বছরেও চালু হয়নি কালাই পৌর অডিটোরিয়াম
নির্মাণকাজ শুরুর সাত বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও চালু হয়নি জয়পুরহাটের কালাই পৌর অডিটোরিয়াম। তিন বছরের মধ্যে কাজ শেষ করার কথা থাকলেও এখনো অসম্পূর্ণ রয়েছে স্থাপনাটি। অর্থসংকট ও বরাদ্দ জটিলতার কথা বলছে পৌরসভা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এদিকে দীর্ঘদিনেও অডিটোরিয়ামটি চালু না হওয়ায় ক্ষুব্ধ স্থানীয় বাসিন্দা ও সাংস্কৃতিক কর্মীরা। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অডিটোরিয়াম নির্মাণে দরপত্রের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৩৮৬ টাকা। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, এ পর্যন্ত কাজের বিপরীতে অর্থ পেয়েছে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এখনো প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। তবে পৌর প্রকৌশলীর ভাষ্য, সম্পন্ন হওয়া কাজের বিপরীতে ঠিকাদারকে বিল দেওয়া হয়েছে। পৌরসভার নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ দেওয়ার মতো আর্থিক সক্ষমতা বর্তমানে নেই। পৌরসভার কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থসংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে বিশেষ বরাদ্দ চেয়ে আবেদন করা হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী তিন মাসের মধ্যে অডিটোরিয়ামটি চালু করার আশা করছেন তাঁরা। কালাই পৌরসভার আওড়া মোড়ের সামনে সিনেমা হল-টু-গঙ্গাদাসপুর সড়কের পাশে অডিটোরিয়ামটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরের ৭ মার্চ প্রকল্পটি অনুমোদন পায়। পৌরসভার লাইসেন্স পরিদর্শক মোস্তা হাসানের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১ এপ্রিল নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রকল্পটির প্রাথমিক নির্মাণ ব্যয় ধরা হয়েছিল ৭ কোটি ৫৬ লাখ ২০ হাজার ৬০৬ টাকা। পরে ১০ শতাংশ ছাড় দিয়ে দরপত্রের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৬ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার ৩৮৬ টাকা। এর মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে ৫ কোটি ৯৮ লাখ ৯ হাজার ৬২০ টাকা এবং পৌরসভার নিজস্ব রাজস্ব তহবিল থেকে ৮১ লাখ ৪০ হাজার ৮৬৬ টাকা দেওয়ার কথা ছিল। পৌরসভা সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন মেয়র খন্দকার হানিমুল আলম জনের মেয়াদকালে প্রকল্পটির দরপত্র সম্পন্ন হয়। নির্মাণকাজের মূল দায়িত্ব পায় মেসার্স কবির ট্রেডার্স। তবে, অভিযোগ রয়েছে, মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কবির ট্রেডার্স হলেও বাস্তবে নির্মাণকাজ করছেন মেসার্স নজরুল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম। কী প্রক্রিয়ায় এক প্রতিষ্ঠানের কাজ অন্য প্রতিষ্ঠান বাস্তবায়ন করছে, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এ বিষয়ে মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কবির ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী একরামুল কবির আহম্মেদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অডিটোরিয়ামের নির্মাণকাজ করছেন কালাইয়ের নজরুল ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী নজরুল ইসলাম। এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের প্রয়োজন নেই উল্লেখ করে তিনি নজরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করতে বলেন। নির্মাণকাজ বাস্তবায়নকারী হিসেবে পরিচিত নজরুল ইসলাম বলেন, এ পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছেন তাঁরা। সেই অনুযায়ী কাজও করেছেন। পরে বাকি অর্থ না পাওয়ায় নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে হয়। নজরুল ইসলাম বলেন, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী এমপির সহযোগিতায় স্থানীয় সরকার বিভাগের বরাদ্দের মধ্যে ব্যাংকে জমা থাকা অর্থ থেকে আরও ১০ লাখ টাকা পেয়েছেন। ওই অর্থ দিয়ে এখন অডিটোরিয়ামের সীমানাপ্রাচীরের কাজ চলছে। তাঁর দাবি, এখনো প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। নির্মাণাধীন অডিটোরিয়ামের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা নজরুল ট্রেডার্সের কর্মচারী আবুল কালাম বলেন, ‘আমি অডিটোরিয়ামটির দেখাশোনা করি। কাজটি শেষও করতে পারছি না, আবার ছেড়েও দিতে পারছি না। পৌরসভা কর্তৃপক্ষ কেন কাজটি বুঝে নিচ্ছে না, তা জানি না। আমার ঠিকাদার বলেছেন, টাকা না পাওয়ায় কাজ করতে পারছেন না। তাঁরা অল্প অল্প টাকা দেন, আমরাও অল্প অল্প করে কাজ করি।’ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দাবি, পৌরসভার নিজস্ব রাজস্ব তহবিল থেকে ৮১ লাখ ৪০ হাজার ৮৬৬ টাকা পরিশোধ করার কথা থাকলেও তা করা হয়নি। এছাড়া স্থানীয় সরকার বিভাগের বরাদ্দের অর্থ পেতে দেরি হওয়ায় কাজ ব্যাহত হয়েছে। করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের সময়ও কয়েক মাস নির্মাণকাজ বন্ধ ছিল বলে দাবি প্রতিষ্ঠানটির। দীর্ঘদিনেও অডিটোরিয়ামটি চালু না হওয়ায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছে। তাঁদের মতে, সামাজিক অনুষ্ঠান, বিয়ে ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের জন্য পৌরসভায় এমন একটি স্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। পৌরসভার থুপসারা গ্রামের বাসিন্দা রায়হান বলেন, ‘পাঁচ-সাত বছর ধরে কাজ চলছে। কাজ প্রায় শেষের দিকে মনে হলেও এখনো শেষ হচ্ছে না। কাজটি কবে শেষ হবে, আমরা কবে সুবিধা পাব? সমস্যা কোথায়, কেন কাজ হচ্ছে না, এসব প্রশ্নের উত্তর চাই।’ আওড়া গ্রামের বাসিন্দা শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘পৌর কমিউনিটি সেন্টারের কাজ পাঁচ-সাত বছর ধরে চলছে, কিন্তু উদ্বোধন হচ্ছে না। এটি চালু হলে পৌরবাসীর নানা অনুষ্ঠান ও ছেলেমেয়ের বিয়ের আয়োজন করতে সুবিধা হতো। আমরা চাই, দ্রুত এটি চালু করা হোক।’ একই গ্রামের বাসিন্দা শাহজাহান আলী বলেন, নির্মাণকাজ অসম্পূর্ণ থাকায় তাঁরা এখনো অডিটোরিয়ামের কোনো সুফল পাচ্ছেন না। কী কারণে কাজ শেষ হচ্ছে না, তা তাঁরা জানেন না। দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করে স্থাপনাটি চালুর দাবি জানান তিনি। কালাই উপজেলা শিল্পী সংঘের সাধারণ সম্পাদক গোলাম আযম ফিতা বলেন, অডিটোরিয়ামের নির্মাণকাজ দীর্ঘ ছয়-সাত বছর ধরে ধীরগতিতে চলছে। বৃষ্টি ও ঝড়ের কারণে খোলা মাঠে অনেক সময় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা যায় না। অডিটোরিয়ামটি চালু হলে শিল্পী ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো উপকৃত হতো। তিনি বলেন, কালাইয়ের সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে এগিয়ে নিতে দ্রুত নির্মাণকাজ শেষ করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দেওয়া উচিত। কালাই পৌরসভার প্রকৌশলী এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, অডিটোরিয়ামের নির্মাণকাজ শেষ করার মেয়াদ দ্বিতীয় দফায় আরও তিন বছর বাড়ানো হয়েছে। বর্তমানে প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৭ সালের জুন পর্যন্ত। ঠিকাদারকে আরও ১০ লাখ টাকা দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে তিনি বলেন, কাজের বিল ঠিকাদারকে দেওয়া হয়েছে। তবে পৌরসভার নিজস্ব রাজস্ব তহবিল থেকে অর্থ দেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দিতেই পৌরসভাকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী এমপি ঠিকাদারকে কাজ চালিয়ে যাওয়ার জন্য ব্যাংকে অবশিষ্ট থাকা অর্থ থেকে কিছু টাকা দিতে বলেন। এরপর আরও ১০ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। পৌরসভা থেকে যে ৮১ লাখ ৪০ হাজার ৮৬৬ টাকা দেওয়ার কথা ছিল, তা দিতে না পারায় গত ১৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে বিশেষ বরাদ্দের জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়।
পরে ২১ সেপ্টেম্বর প্রতিমন্ত্রীর ডিও লেটার সংযুক্ত করে আবার আবেদন পাঠানো হয়েছে।’ বিশেষ বরাদ্দ পাওয়া গেলে অর্থের কারণে কাজ আটকে থাকবে না বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বরাদ্দ না পেলেও আগামী দুই-তিন মাসের মধ্যে অডিটোরিয়ামটি চালু করার চেষ্টা চলছে। কালাই পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ফয়সাল আহমেদ বলেন, অর্থায়নসংক্রান্ত জটিলতার কারণে অডিটোরিয়ামের কাজ দীর্ঘদিন ধরে স্থবির হয়ে আছে। এ সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী ডিও লেটার দিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অর্থসংক্রান্ত জটিলতা দ্রুত নিরসন হবে বলে তাঁরা আশা করছেন। ফয়সাল আহমেদ বলেন, ‘কালাই উপজেলার মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি এই পৌর অডিটোরিয়াম। আমরা এটি পুরোপুরি চালু করতে চাই। আশা করছি, আগামী তিন মাসের মধ্যে চালু করতে পারব।’ তিনি আরও বলেন, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পুরো কাজ শেষ না হলেও ইতিমধ্যে নির্মিত স্থাপনাটিকে পৌরসভার আয়বর্ধক হিসেবে কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে, স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রশ্ন, সাত বছরের বেশি সময় ধরে নির্মাণকাজ চলার পরও কেন অডিটোরিয়ামটি পুরোপুরি চালু করা যায়নি? তাঁদের প্রত্যাশা, অর্থসংকট ও প্রশাসনিক জটিলতা নিরসনের পাশাপাশি নির্মাণকাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে দ্রুত স্থাপনাটি জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।