চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ডেঙ্গু সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে করণীয় নিয়ে সভা
বর্ষা পেরিয়ে ডেঙ্গুর চোখ রাঙানি ক্রমেই বাড়ছে। এডিস মশার বংশবিস্তার ঠেকাতে এবার মাঠ প্রশাসনকে নড়েচড়ে বসার নির্দেশ দিয়েছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। ডেঙ্গু প্রতিরোধে শুধু হাসপাতাল কেন্দ্রিক চিকিৎসা নয়, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা অভিযান, নিয়মিত নজরদারি এবং জনসচেতনতা তৈরিতে সমন্বিতভাবে কাজ করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে ডেঙ্গু সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে করণীয় নিয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট চিঠিতে ডেঙ্গু প্রতিরোধ, চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদারে একগুচ্ছ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। চিঠির আলোকে জেলা প্রশাসনের সভায় ডেঙ্গুর সম্ভাব্য বিস্তার ঠেকাতে প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা নয়, মশার উৎসেই আঘাত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল, অফিস-আদালত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, আবাসিক ও বাণিজ্যিক স্থাপনা, নির্মাণাধীন ভবনসহ বিভিন্ন স্থানে জমে থাকা পানি অপসারণ এবং নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। ফেলে রাখা প্লাস্টিকের পাত্র, টব, ডাবের খোসা, পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণসামগ্রী কিংবা যেকোনো পাত্রে জমে থাকা স্বচ্ছ পানিই এডিস মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে। ফলে এসব জায়গায় নিয়মিত নজরদারি ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানোর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গী। জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে জেলা প্রশাসন আয়োজিত সভায় বিশেষ অতিথি ছিলেন স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক উজ্জল কুমার ঘাষ, সিভিল সার্জন ডাঃ এ কে এম শাহাব উদ্দিন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিষ্ট্রেট মোঃ আনিসুর রহমান, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মোসাঃ সাহিদা আখতার, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী মোঃ মামুনুর রশীদ। এসময় বিভিন্ন সরকারী বেসরকারী প্রতিষ্ঠান প্রধানগণ উপস্থিত ছিলেন। সভায় জেলায় ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় করনীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো হবে, নাকি তার আগেই মশার প্রজননস্থলে আঘাত করা হবে? প্রশাসনের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ এ বিষয়েই। চিঠিতে ডেঙ্গু রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হাসপাতালগুলোকে প্রস্তুত রাখার নির্দেশনা রয়েছে। ডেঙ্গু রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষার সুবিধা, ওষুধ ও চিকিৎসাসামগ্রী প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি প্রয়োজনে আলাদা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বিশেষ করে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টিম ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং প্রশিক্ষণের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ডেঙ্গু রোগীর অবস্থা দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে, এ কারণে রোগী শনাক্ত থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও পর্যবেক্ষণে কোনো ধরনের গাফিলতি না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসায় জাতীয় গাইডলাইন অনুসরণ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকদের সহায়তা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। জেলা-উপজেলায় সমন্বিত অভিযান জরুরি-ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে জেলা প্রশাসন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য বিভাগ, পৌরসভা ও উপজেলা প্রশাসনের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। শুধু শহর কিংবা পৌর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়, প্রতিটি উপজেলা, ইউনিয়ন ও জনবসতিপূর্ণ এলাকায় মশার প্রজননস্থল চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির কার্যক্রম জোরদারের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধে বিভিন্ন পর্যায়ে প্রচার-প্রচারণা চালানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। ‘সচেতনতা’-ডেঙ্গু প্রতিরোধে জনসচেতনতার বিকল্প নেই। কিন্তু শুধু মাইকিং, পোস্টার কিংবা সভা-সেমিনারে সচেতনতার কথা বললেই দায়িত্ব শেষ হয় না। মানুষের ঘরবাড়ি, আশপাশের ড্রেন, ছাদ, নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত জায়গা কিংবা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের আঙিনায় জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ হচ্ছে কি না—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে ডেঙ্গু প্রতিরোধ বিষয়ক প্রচার-প্রচারণা জোরদারের কথাও বলা হয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ নিজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করেও জনসচেতনতামূলক বার্তা প্রচারে উৎসাহিত করার নির্দেশনা রয়েছে। নজরদারিতে জোর, চাওয়া হচ্ছে নিয়মিত প্রতিবেদন-ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করার পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশনাও রয়েছে। অর্থাৎ শুধু অভিযান চালিয়ে ছবি তুলে দায়িত্ব শেষ করার সুযোগ নেই, কার্যক্রমের বাস্তব ফলাফলও নজরদারির আওতায় রাখার কথা বলা হয়েছে। এদিকে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে বলা হয়েছে, ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে প্রদত্ত নির্দেশনাগুলো সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বাস্তবায়ন করতে হবে। প্রশাসনের জন্য এটিই এখন মূল বার্তা—ডেঙ্গু পরিস্থিতি অবনতি হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে আগেভাগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। চাঁপাইনবাবগঞ্জে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে আজকের সভা নিছক আরেকটি প্রশাসনিক বৈঠক নয়, বরং সামনে থাকা সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময়সীমা হিসেবেও দেখা হচ্ছে। কারণ ডেঙ্গুর বাহক এডিস মশা কোনো প্রশাসনিক সীমানা মানে না। একটি বাড়ির ছাদে জমে থাকা পানি, একটি নির্মাণাধীন ভবনের পাত্র, একটি পরিত্যক্ত টায়ার কিংবা একটি নোংরা ড্রেন থেকেই শুরু হতে পারে সংক্রমণের নতুন চক্র।
ফলে ডেঙ্গু প্রতিরোধে একদিনের অভিযান নয়, প্রয়োজন ধারাবাহিক ও কঠোর নজরদারি। বিশেষজ্ঞদের মতে, রোগী হাসপাতালে আসার পর চিকিৎসা দেওয়ার চেয়ে এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করে সংক্রমণের পথ বন্ধ করাই বেশি কার্যকর। তাই চাঁপাইনবাবগঞ্জে এখন সবচেয়ে জরুরি হচ্ছে নির্দেশনাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া। প্রশাসনিক সভার সিদ্ধান্ত যদি মাঠে দৃশ্যমান না হয়, পরিচ্ছন্নতা অভিযান যদি লোকদেখানোতে সীমাবদ্ধ থাকে এবং মশার প্রজননস্থল যদি আগের মতোই পড়ে থাকে, তাহলে কাগজে যত নির্দেশনাই থাকুক, ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সাফল্য আসবে না। তাই জেলা ও উপজেলা প্রশাসন, পৌরসভা, স্বাস্থ্য বিভাগ এবং সংশ্লিষ্ট সব সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে একযোগে মাঠে নামার তাগিদ উঠেছে। ডেঙ্গু প্রতিরোধে এখন আর ঢিলেমির সুযোগ নেই, প্রতিরোধ করতে হবে মশার উৎস, চিকিৎসা প্রস্তুত রাখতে হবে হাসপাতালে, আর সচেতন করতে হবে মানুষকে ঘরে ঘরে। তাহলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে।