নাটোরের বাগাতিপাড়ায় আগাম খেজুর গুড় তৈরির প্রস্তুতি ॥ গাছ প্রস্তুতিতে ব্যস্ত গাছিরা
শীতের আগমনী বার্তা জানান দিচ্ছে খেজুরের রস। আর সেই রস সংগ্রহ করে সুস্বাদু ও ঐতিহ্যবাহী খেজুরের গুড় তৈরির জন্য গাছ প্রস্তুতিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন নাটোরের বাগাতিপাড়ার গাছিরা। উপজেলার বিভিন্ন মাঠ ও গ্রামাঞ্চলে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত খেজুর গাছ পরিচর্যা, ঝোড়া ও রস সংগ্রহের উপযোগী করে তুলতে ব্যস্ত রয়েছেন তারা। আগাম গুড় তৈরির লক্ষ্যে গাছিরা খেজুর গাছের ওপরের অংশ ঝুড়ে পরিষ্কার করছেন। এরপর গাছের নির্দিষ্ট স্থানে নলি ও বাঁশের সরঞ্জাম বসিয়ে রস সংগ্রহের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। স্থানীয়ভাবে মৌসুমভিত্তিক প্রতিটি খেজুর গাছ ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত লিজ নিয়ে থাকেন অনেক গাছি। এরপর কয়েক দফায় গাছ পরিচর্যা ও ঝোড়ার কাজ শেষ করে শুরু হয় রস সংগ্রহ। স্থানীয় গাছি দবির উদ্দিন বলেন, তাঁর নিজস্ব কোনো খেজুর গাছ নেই। প্রতিবছর গাছ লিজ নিয়ে গুড় তৈরি করেন তিনি। এবারও প্রায় ৭০ থেকে ৮০টি গাছ থেকে রস সংগ্রহ করে গুড় তৈরির প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাঁর দাবি, তারা সম্পূর্ণ খাঁটি খেজুরের গুড় তৈরির চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, খাঁটি খেজুরের গুড়ের চাহিদা ও দাম দুটোই বেশি। তবে কিছু অসাধু ব্যক্তি খেজুরের রসের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে ভেজাল গুড় তৈরি করে কম দামে বাজারজাত করেন। এতে প্রকৃত গাছিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন এবং খাঁটি গুড় তৈরি করেও ন্যায্য দাম পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। ভেজাল প্রতিরোধে প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি জানান তিনি। অপর গাছি জামাল উদ্দিন বলেন, খেজুরের রসের সঙ্গে চিনি মিশিয়ে গুড় তৈরির প্রবণতা বন্ধে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানো প্রয়োজন। ভেজাল গুড় বাজারে ছড়িয়ে পড়লে খেজুরের গুড়ের স্বাদ, গন্ধ ও স্বকীয়তা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি গ্রামবাংলার এই ঐতিহ্যও একসময় হারিয়ে যেতে পারে। বাগাতিপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সৈকত মো. রেজওয়ানুল হক বলেন, খেজুরের রস শিশুদের কাছে অত্যন্ত প্রিয়। বিশেষ করে শীতকালে রস ও মুড়ি গ্রামাঞ্চলের মানুষের কাছে জনপ্রিয় খাবার। তবে কাঁচা খেজুরের রস পান করলে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ, এনসেফালাইটিস ও ডায়রিয়াসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যঝুঁকি দেখা দিতে পারে। তাই কাঁচা রস পান না করে, ভালোভাবে জ্বাল দিয়ে খাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। পাশাপাশি খেজুরের গুড়ে ভেজাল মেশানো হচ্ছে কি না, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান। বাগাতিপাড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. শামসুল ইসলাম বলেন, খেজুরের রস ও গুড় গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী ও সুস্বাদু খাবার। শীত মৌসুমে এই রস ও গুড় দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের পিঠা-পায়েস। এতে গ্রামীণ জনপদে তৈরি হয় শীতের আলাদা আমেজ। কেউ যাতে খেজুরের রস ও গুড়ে ভেজাল মেশাতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসন সতর্ক রয়েছে। প্রয়োজন হলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে ভেজাল প্রতিরোধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। শীত মৌসুমকে সামনে রেখে এখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত বাগাতিপাড়ার গাছিরা। তাদের আশা, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবার খেজুরের রসের ভালো ফলন হবে। আর সেই রস থেকে তৈরি হবে সুস্বাদু খাঁটি খেজুরের গুড়, যা শীতের পিঠা-পায়েসে ফিরিয়ে আনবে গ্রামবাংলার চিরচেনা ঐতিহ্য ও স্বাদ।