অনাথ আশ্রম থেকে এস.এস.সি পাশ করেছে ৯ বালক
এবছর পঞ্চগড়ের একটি অনাথ আশ্রম থেকে এস.এস.সি পাশ করেছে ৯ বালক। কারও বয়স তখন মাত্র ছয় বছর। কেউ হারিয়েছে বাবাকে, কেউ মাকে। আবার কারও জীবনে বাবা-মা দুজনেরই কোনো স্মৃতি নেই। কেউ পরিবারের কাছ থেকে হারিয়ে গেছে, কেউ দারিদ্র্যের কারণে ঠাঁই নিয়েছে অনাথ আশ্রমে। আপনজনের স্নেহ-ভালোবাসা ছাড়াই বেড়ে ওঠা সেই শিশুদের জীবনে এবার এসেছে সাফল্যের নতুন অধ্যায়। পঞ্চগড়ের আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে বেড়ে ওঠা নয় বালক এবারের এস.এস.সি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। তাদের কেউ পরিবারের খোঁজ পাওয়ার স্বপ্ন দেখে, কেউ স্বপ্ন দেখে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে ভালো মানুষ হওয়ার। এসএসসি পাসের আনন্দের মাঝেও তাই তাদের মনে রয়েছে স্বজন হারানোর দীর্ঘশ্বাস। উত্তীর্ণ নয়জন হলেন, সাকিব হাওলাদার, সুমন মিয়া, আল-আমিন, সাকিব, নিরব ইসলাম, জুয়েল হাওলাদার, মেহেদি হাসান, আনিছুর ইসলাম ও আলিউল ইসলাম। তারা সবাই পঞ্চগড় সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। সুমন মিয়া ছয় বছর বয়সে পরিবারের কাছ থেকে হারিয়ে যায়। এরপর একটি সেন্টারে থাকার পর ২০১৫ সালে আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে আসে। সেখানে কেটে যায় তার শৈশব ও কৈশোরের প্রায় ১০ বছর। সুমন বলে, ‘ছয় বছর বয়সে পরিবার থেকে হারিয়ে যাই। কোথা থেকে হারিয়েছি, সেটাও মনে নেই। পরে একটি সেন্টারে ছিলাম। সেখান থেকে মালেক স্যারের মাধ্যমে ২০১৫ সালে এখানে আসি। এখানে ১০ বছর পড়াশোনা করার পর এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়ে পাস করেছি। খুব ভালো লাগছে।’ সুমন বলে, ‘হয়তো আমার পরিবার আমার সঙ্গে থাকলে তারাও অনেক খুশি হতো। কিন্তু তারা আমার সঙ্গে নেই। তারা বেঁচে আছে, নাকি মারা গেছে, তাও জানি না। আমার পরিবারের কোনো ঠিকানাও নেই।’ ‘ভালো মানুষের মতো মানুষ হতে চাই’। নিরব ইসলামও প্রায় ১০ বছর ধরে শিশু নগরীতে রয়েছে। সেখান থেকেই পড়াশোনা করে পঞ্চগড় সরকারি টেকনিক্যাল স্কুল ও কলেজ থেকে এসএসসি পাস করেছে। নিরব বলে, ‘আমি ১০ বছর ধরে আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে আছি। এখান থেকে পড়াশোনা করে এসএসসি পাস করেছি। আমি খুব খুশি।’ ভবিষ্যতে ‘বড় হয়ে একজন ভালো মানুষের মতো মানুষ হতে চাই।’ আনিছুর ইসলামের ছোটবেলাতেই বাবা মারা যান। সংসারের অভাবের কারণে তার মা পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছিলেন না। পরে পরিচিতদের মাধ্যমে আহছানিয়া মিশনের কথা জানতে পেরে তাকে সেখানে ভর্তি করান। আনিছুর বলে, ‘ছোটবেলায় আমার বাবা মারা যান। আমার মা পড়াশোনার খরচ চালাতে পারছিলেন না। পরে এই মিশনের কথা জানতে পেরে আমাকে এখানে পাঠান, যেন আমি ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারি এবং মানুষের মতো মানুষ হতে পারি।’ মেহেদি হাসানের বাবাও ছোটবেলায় মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর সংসার চালানোর পাশাপাশি ছেলের পড়াশোনার খরচ বহন করা তার মায়ের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়ে। পরে মেহেদিকে আহছানিয়া মিশন শিশু নগরীতে নিয়ে আসেন তিনি। মেহেদি বলে, ‘বাবা ছোটবেলায় মারা গিয়েছিলেন। তখন মা সংসার চালাতে পারছিলেন না, আমাকে পড়াশোনাও করাতে পারছিলেন না। পরে এখানে নিয়ে আসেন। স্যাররা পড়াশোনা, খাওয়া-দাওয়া ও থাকার সব ব্যবস্থা করেছেন। এখান থেকেই এসএসসি পরীক্ষা দিতে পেরেছি।’ প্রায় ১০ বছর ধরে শিশু নগরীতে থাকা মেহেদি জানায়, সবার দোয়া ও আল্লাহর রহমতে ভালো ফল করেছে। আল-আমিন ইসলাম সাত বছর বয়সে পরিবারের কাছ থেকে হারিয়ে যায়। এরপর আর বাবা-মায়ের সন্ধান পায়নি সে। এসএসসি পাসের আনন্দের দিনেও সেই শূন্যতার কথা মনে পড়ে তার। আল-আমিন বলে, ‘আজকের ফলাফল শুধু আনন্দের নয়, এর সঙ্গে একটা কষ্টও আছে। যদি আজ আমার বাবা-মা আমার পাশে থাকতেন, তাহলে ভালো লাগত। অন্যদের বাবা-মা সন্তানদের পরীক্ষা দেওয়ার সময় পাশে থাকেন, ফলাফল হলে খুশি হন। আমিও তো তাদের ছেলে। আমি পাস করেছি, তারা যদি জানতে পারত, তারাও নিশ্চয়ই খুশি হতো।’ ‘বড় হয়ে একজন সুনাগরিক হতে চাই।