বুধবার, আগস্ট ১২, ২০২৭
টার্মিনালের মেরামত কাজ চলমান-চলতি সপ্তাহেই গ্যাস সরবরাহ বাড়ার আশাবাদ

গ্যাস-কয়লা সংকটে ৪১ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ ॥ জনজীবনে ভোগান্তিÍ-সমাধানের চেষ্টায় সরকার

বিশেষ প্রতিবেদক ॥ ১১ আগস্ট ২০২৬ ০৬:১৫ অপরাহ্ন জাতীয়
বিশেষ প্রতিবেদক ॥ ১১ আগস্ট ২০২৬ ০৬:১৫ অপরাহ্ন
গ্যাস-কয়লা সংকটে ৪১ বিদ্যুৎ কেন্দ্রে উৎপাদন বন্ধ ॥ জনজীবনে ভোগান্তিÍ-সমাধানের চেষ্টায় সরকার

গ্যাস ও কয়লা সংকটে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি সংকট ও মেরামতের কারণে ৪১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। যেগুলো চালু রয়েছে, সেগুলোতেও অধিকাংশ কেন্দ্রও সক্ষমতা অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে না। ফলে রাজধানীর বাইরে শিল্পাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তীব্র বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে জনগণের ভোগান্তি বেড়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে লোডশেডিং আগের সব রেকর্ড ছাড়িয়েছে। এলএনজি টার্মিনানের মেরামত কাজ চলমান, পুরোপুরি সচল হলে দুই-তিন দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। বিদ্যুৎ সমস্যা সমাধানের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করে দ্রুতই জনমনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা চালাচ্ছে সরকার। জানা গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতির প্রধান কারণ গ্যাস সংকট। পট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ২৫২ কোটি ঘনফুট। লোডশেডিং নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজন অন্তত ১০০ থেকে ১১০ কোটি ঘনফুট। অথচ বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে মাত্র ৭০ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার এক-তৃতীয়াংশেরও কম গ্যাস পাচ্ছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো। ফলে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও অনেক কেন্দ্র পূর্ণমাত্রায় চালানো যাচ্ছে না। একসময় গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও বর্তমানে তা নেমে এসেছে সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াটে। গত ২১ জুলাই কক্সবাজারের মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়। এতে দৈনিক প্রায় ৬০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে যায়। আংশিক মেরামতের পর বর্তমানে প্রায় ২৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ পাওয়া যাচ্ছে। তবে টার্মিনালটি এখনও পূর্ণ সক্ষমতায় ফেরেনি। পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী মো. শোয়েব গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, টার্মিনালের মেরামত শেষ হতে আরও দুই-তিন দিন লাগতে পারে। সবকিছু ঠিক থাকলে চলতি সপ্তাহেই গ্যাস সরবরাহ বাড়বে। টার্মিনালটি পুরোপুরি সচল হলে আরও ৩০ থেকে ৩৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। গ্যাসের পাশাপাশি কয়লা সরবরাহের সংকটও বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রভাব ফেলেছে। ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট সক্ষমতার পটুয়াখালী তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কুতুবদিয়ায় বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে কয়লা খালাসে বিলম্ব হচ্ছে। ফলে কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্রে পৌঁছাতে সময় লাগছে বেশি। এদিকে, ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র থেকেও বিদ্যুৎ সরবরাহ কমেছে। বাংলাদেশে কেন্দ্রটি সাধারণত প্রায় ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করলেও কয়েকদিন ধরে তা ৮০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটে নেমে এসেছে। ঝাড়খণ্ডে বন্যার কারণে কয়লা ভিজে যাওয়ায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মোট সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ৯৪৫ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে বর্তমানে উৎপাদন হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট। বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যাওয়ায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন গ্রাম ও মফস্বলের মানুষ। কোথাও ঘণ্টায় ঘণ্টায় বিদ্যুৎ যাচ্ছে, আবার কোথাও একবার বিদ্যুৎ চলে গেলে কয়েক ঘণ্টাতেও ফিরছে না। তীব্র গরমের মধ্যে ফ্যান, এসি ও পানির পাম্প চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ব্যাহত হচ্ছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও অনলাইনভিত্তিক কাজ। গ্যাস সংকটের সঙ্গে বিদ্যুৎ ঘাটতি যোগ হওয়ায় শিল্পাঞ্চলেও উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে উৎপাদন লাইন বন্ধ হয়ে যায়। পরে বিদ্যুৎ এলেও যন্ত্রপাতি স্বাভাবিক করতে সময় লাগে। উৎপাদন সচল রাখতে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান জেনারেটর ব্যবহার করছে। এতে জ্বালানি ব্যয় ও উৎপাদন খরচ-দুটিই বাড়ছে। লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো হয়েছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে গ্যাসের বরাদ্দ বাড়ানোর জন্য পেট্রোবাংলাকে অনুরোধ করা হয়েছে। যেসব কেন্দ্র দ্রুত জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়াতে পারবে, সেগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস দেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো গেলে বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়বে এবং লোডশেডিং কিছুটা কমানো সম্ভব হবে। গ্যাস ও কয়লার সংকট সামাল দিতে ব্যয়বহুল তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকেও উৎপাদন বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। তবে এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় এবং সরকারের ভর্তুকির চাপ বাড়ে। পিডিবির কর্মকর্তারা বলছেন, সাময়িকভাবে তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো গেলেও দীর্ঘ সময় এভাবে চালানো ব্যয়বহুল। তাই গ্যাস ও কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক করাই এখন সবচেয়ে জরুরি। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী মো. রেজাউল করিম আশা করছেন, এক-দুই দিনের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। গ্যাস সংকটের পাশাপাশি কয়লা সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় লোডশেডিং বেড়েছে। অন্যদিকে পেট্রোবাংলার কর্মকর্তারা বলছেন, এলএনজি টার্মিনাল পুরোপুরি সচল হলে দুই-তিন দিনের মধ্যে গ্যাস সরবরাহ বাড়তে পারে। তবে তাপমাত্রা বাড়লে বিদ্যুতের চাহিদাও বাড়বে। ফলে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে লোডশেডিং পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হতে পারে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংকট দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন কমে যাওয়া, আমদানি নির্ভর এলএনজির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং জ্বালানি সরবরাহের অনিশ্চয়তার ফল। সাময়িকভাবে গ্যাস সরবরাহ বাড়িয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং জ্বালানি অপচয় রোধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন।