বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ০৮, ২০২৭
নেট দুনিয়ায় প্রশংসার ঝড়

প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে গাইবান্ধার ‘এক টাকার মাস্টার’ লুৎফর রহমানকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা-অবসরভাতা প্রদান

গাইবান্ধা প্রতিনিধি ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৫:৫৬ অপরাহ্ন জাতীয়
গাইবান্ধা প্রতিনিধি ০৭ অক্টোবর ২০২৬ ০৫:৫৬ অপরাহ্ন
প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগে গাইবান্ধার ‘এক টাকার মাস্টার’ লুৎফর রহমানকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা-অবসরভাতা প্রদান

মাত্র এক টাকার বিনিময়ে ৫২ বছর ধরে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়িয়ে আসছেন গাইবান্ধার ‘এক টাকার মাস্টার’ লুৎফর রহমান। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক না হয়েও তাঁর দীর্ঘদিনের এই অসামান্য শিক্ষাসেবার স্বীকৃতি দিয়েছে রাষ্ট্র। তাঁর জন্য অবসরভাতা প্রদানের অনুশাসন জারি করেছেন প্রধানমন্ত্রী। এ উদ্যোগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ নেট দুনিয়ায় ব্যাপক প্রশংসা শুরু হয়েছে। বিশ্ব শিক্ষক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে লুৎফর রহমানকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানে তাঁর দীর্ঘ শিক্ষাসেবা, জীবনসংগ্রাম ও দরিদ্র শিশুদের জন্য নিবেদিত ভূমিকার কথা উঠে আসে। তাঁর বক্তব্য শুনে প্রধানমন্ত্রী তাঁকে অবসরভাতা দেওয়ার অনুশাসন জারি করেন। বিষয়টি অনুষ্ঠানে জানান শিক্ষামন্ত্রী। লুৎফর রহমান গাইবান্ধা সদর উপজেলার গিদারী ইউনিয়নের বাগুড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা। নদীভাঙন ও দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেই বেড়ে উঠেছেন তিনি। নিজের জীবনে শিক্ষার সুযোগ-সুবিধার অভাব তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই উপলব্ধি থেকেই তিনি সিদ্ধান্ত নেন অর্থের অভাবে কোনো শিশুর পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়। ১৯৭৪ সাল থেকে দরিদ্র পরিবারের শিশুদের পড়ানো শুরু করেন লুৎফর রহমান। প্রথম দিকে বিনা পারিশ্রমিকেই পড়াতেন। পরে শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের অনুরোধে প্রতীকী হিসেবে এক টাকা করে নেওয়া শুরু করেন। সেই থেকে তিনি স্থানীয় মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন ‘এক টাকার মাস্টার’ নামে। দীর্ঘ ৫২ বছরে তাঁর কাছে পড়েছে কয়েক প্রজন্মের শিক্ষার্থী। বর্তমানে প্রতিদিনই তিনি বহু শিশুকে কয়েকটি ব্যাচে পাঠদান করেন। তাঁর শিক্ষার্থীদের অনেকেই পরবর্তীতে সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। তবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পাওয়া অর্থ নয়, তাদের সফলতাকেই নিজের সবচেয়ে বড় অর্জন মনে করেন তিনি। লুৎফর রহমানের শিক্ষাদানের ধরনও ছিল ব্যতিক্রমী। কোনো বড় অবকাঠামো, আধুনিক শ্রেণিকক্ষ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা ছাড়াই বছরের পর বছর শিশুদের পড়িয়েছেন তিনি। কখনো বাড়ির উঠানে, কখনো খোলা জায়গায়, আবার কখনো গাছতলায় বসিয়েও চলেছে তাঁর পাঠদান। এক টাকা তাঁর কাছে কখনোই উপার্জনের মাধ্যম ছিল না। বরং দরিদ্র শিক্ষার্থীদের আত্মসম্মান বজায় রেখে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত রাখার একটি প্রতীকী ব্যবস্থা ছিল এটি। তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়া। রাষ্ট্রীয় সম্মাননা এবং অবসরভাতা প্রদানের উদ্যোগে আবেগাপ্লুত হন লুৎফর রহমান। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সুস্থ থাকলে শিশুদের পড়িয়ে যেতে চান তিনি। তাঁর কাছে শিক্ষকতা কোনো চাকরি নয়, এটি মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সমাজ গড়ার একটি দায়িত্ব। লুৎফর রহমানের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছেন। অনেকেই প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগকে একজন নীরব শিক্ষাযোদ্ধার যথাযথ মূল্যায়ন হিসেবে অভিহিত করছেন। নেটিজেনদের অনেকের মতে, পদ-পদবি কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় একজন মানুষের প্রকৃত অবদানের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না। মানুষের জন্য দীর্ঘদিনের নিঃস্বার্থ কাজই একজন মানুষকে মানুষের হৃদয়ে স্থান করে দেয়। লুৎফর রহমান তার উজ্জ্বল উদাহরণ।