শনিবার, অক্টোবর ১০, ২০২৭
আমের চেয়ে ক্যারেট খরচ বেশি

সিন্ডিকেটের জিম্মায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম চাষী ও অনলাইন উদ্যোক্তারা

মোঃ নাদিম হোসেন (নিজস্ব প্রতিনিধি) ২৪ জুন ২০২৬ ০৫:৫৩ অপরাহ্ন চাঁপাইনবাবগঞ্জ
মোঃ নাদিম হোসেন (নিজস্ব প্রতিনিধি) ২৪ জুন ২০২৬ ০৫:৫৩ অপরাহ্ন
সিন্ডিকেটের জিম্মায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম চাষী ও অনলাইন উদ্যোক্তারা

মধুমাস জ্যৈষ্ঠের শেষ হলেও আমের রাজধানী চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম বাজারগুলোতে চলছে জমজমাট বেচা-কেনা। তবে এই উৎসবের আমেজে বড় ধরনের বাগড়া দিয়েছে প্লাস্টিকের ক্যারেট (ক্রেট) লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে ঠেকেছে যে,আমের মূল্যের চেয়ে ক্রেট ও আনুষঙ্গিক খরচ অনেক ক্ষেত্রে ছাড়িয়ে যাচ্ছে। প্লাস্টিকের ক্রেটের এই আকাশচুম্বী দাম এবং কৃত্রিম সংকটে চরম বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় আম চাষী, সাধারণ ব্যবসায়ী এবং উদীয়মান ই-কমার্স উদ্যোক্তারা। গত বছরের তুলনায় এবার প্রায় দ্বিগুণ দামে বিক্রি হচ্ছে ক্যারেট, যার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে আমের চূড়ান্ত মূল্যের ওপর। আম সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, গুটিকয়েক অসাধু ব্যবসায়ীর সিন্ডিকেট ও অবৈধ মজুতদারির কারণেই বাজারে এই নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।


পরিবহনের সময় আম যেন নষ্ট না হয়, সেজন্য বাঁশের ঝুড়ি বা কাগজের কার্টুনের বিকল্প হিসেবে এখন সবচেয়ে জনপ্রিয় ও নিরাপদ মাধ্যম প্লাস্টিকের ক্রেট। কিন্তু এই ক্রেট ঘিরেই এবার শুরু হয়েছে চরম অরাজকতা। স্থানীয় ব্যবসায়ী ও অনলাইন উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, গত বছর যে সাধারণ মানের প্লাস্টিক ক্রেট বিক্রি হয়েছিল ১৫০ থেকে ১৭০ টাকায়, এবার তা বাজারে ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, ৩২০ টাকা পর্যন্ত ঠেকেছে। আর একটু ভালো মানের ও আমদানিকৃত ক্রেটের দাম হাঁকা হচ্ছে ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা। ফলে হিসাব কষে দেখা যাচ্ছে, ৭০০ টাকা মূল্যের এক মণ আম দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠাতে ক্রেট ও কুরিয়ার খরচ মেলাতেই লেগে যাচ্ছে প্রায় এক হাজার টাকা। অর্থাৎ, আমের নিজস্ব দামের চেয়ে তা প্যাকেজিং ও পরিবহনের খরচ দ্বিগুণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। উদ্যোক্তা ও আম সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা যায়, দেশে মানসম্মত ক্রেট তৈরির পর্যাপ্ত কারখানা না থাকায় তারা মূলত বিদেশ থেকে ফলসহ আসা ব্যবহৃত বা ‘রি-ইউজড’ ক্রেটের ওপর নির্ভরশীল। সাম্প্রতিক সময়ে ভারত থেকে ফল আমদানি কমে যাওয়ায় এই পুনর্ব্যবহারযোগ্য ক্রেটের স্বাভাবিক সরবরাহ অনেকটাই সংকুচিত হয়েছে। অপরদিকে, এ বছর চাঁপাইনবাবগঞ্জে অনলাইন আম ব্যবসার ব্যাপক প্রসার ঘটায় ক্রেটের চাহিদাও বেড়েছে বহুগুণ।


আর এই চাহিদাকে পুঁজি করেই মাঠে নেমেছে একশ্রেণীর অসাধু চক্র। অভিযোগ উঠেছে, মৌসুম শুরুর আগেই কোটি কোটি টাকার ক্রেট সস্তায় কিনে বড় বড় গুদামে মজুত করে রেখেছে এই সিন্ডিকেট। বাজারে এখন কৃত্রিম সংকট তৈরি করে তারা ইচ্ছেমতো দাম বাড়াচ্ছে, যা সাধারণ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। ক্ষোভ প্রকাশ করে আম ব্যবসায়ী ও অনলাইন আম উদ্যোক্তা মোঃ আহসান হাবিবসহ অনেকেই বলেন, ‘আমরা যখন অনলাইনের মাধ্যমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের আম দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছি, ঠিক তখনই ক্রেটের এই সিন্ডিকেট আমাদের লাভের গুড় পিঁপড়াকে খাইয়ে দিচ্ছে। আমের চেয়ে যদি ক্রেটের পেছনেই বেশি টাকা চলে যায়, তবে আমরা ব্যবসা করব কীভাবে? আর ভোক্তাদেরই বা সুলভ মূল্যে আম দেব কীভাবে?’ চাঁপাইনবাবগঞ্জে ক্যারেট (ক্রেট) সিন্ডিকেটের এই নৈরাজ্য ঠেকাতে এবং আম ব্যবসাকে বাঁচাতে এখন স্থানীয়ভাবেই ক্রেট তৈরির কারখানা স্থাপনের জোর দাবি উঠেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মোঃ খাইরুল ইসলাম এবং জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা মোঃ মোমিনুল হক (বিসিএস-কৃষি) জানান, আম চাষী, ব্যবসায়ী, ক্রেট বিক্রেতা এবং পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মধ্যে একটি সুনির্দিষ্ট সমন্বয় জরুরি। একই সাথে স্থানীয় পর্যায়ে ক্রেট উৎপাদন শিল্প স্থাপনে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণের সহায়তা দেওয়া হলে দীর্ঘমেয়াদে এই সংকটের স্থায়ী অবসান ঘটবে।


এদিকে, ক্রেট বাজারের এই অস্থিরতা ও অসাধু মজুতদারদের রুখতে মাঠে নেমেছে জেলা প্রশাসন ও জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মারুফ আফজাল রাজন জানান, বাজার নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত মনিটরিং টিম কাজ করছে। কোনো ব্যবসায়ী ক্রেটের কৃত্রিম সংকট তৈরি করলে কিংবা অতিরিক্ত মূল্য রাখলে তার বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের প্রধান অর্থকরী ফসল আমের ঐতিহ্য ধরে রাখতে, চাষীদের অধিকার রক্ষা করতে এবং দেশের সাধারণ ভোক্তাদের ন্যায্যমূল্যে আম খাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে এই ক্যারেট (ক্রেট) সিন্ডিকেট দ্রুত ভেঙে দেওয়া সময়ের দাবি। প্রশ্ন হচ্ছে, অভিযানের বিষয়টি কি শুধু ঘোষণাতেই সীমাবন্ধ, নাকি আসল অভিযানে বন্ধ হবে এই ক্যারেট সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম? কথায় নয়, বাস্তবে প্রতিফলন দেখতে চায় জেলার আম ব্যবসায়ী, চাষী ও উদ্যোক্তারা। অন্যথায়, লোকসানের মুখে পড়ে আম চাষ ও ব্যবসার সাথে জড়িত হাজারো মানুষ তাদের জীবিকা হারাবে।