ভোলাহাটে আদালতের আদেশ গোপন করে আম বাগান ও জমি নিয়ে অপপ্রচারের অভিযোগ
চাঁপাইনবাবগঞ্জের ভোলাহাট উপজেলার জামবাড়িয়া ইউনিয়নের আন্দিপুর মৌজার আর.এস ১২২ ও ১২৩ নম্বর খতিয়ানের সম্পত্তি ও আমবাগান নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যম, অনলাইন পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। মামলার বাদীপক্ষের অভিযোগ, গত ২৬ জুলাই ২০২৬ তারিখে বিজয় টেলিভিশনসহ বিভিন্ন অনলাইন ও ফেসবুক পেজে প্রকাশিত প্রতিবেদনে চলমান দেওয়ানি মামলার গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি আদালতের আদেশ ও পরবর্তী আইনি কার্যক্রমের তথ্য উপস্থাপন করা হয়নি। ফলে বিষয়টি একপাক্ষিকভাবে প্রচারিত হয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে বলে দাবি করেছেন তারা। বাদীপক্ষের দাবি-ভোলাহাটে আমবাগান নিয়ে প্রচারিত সংবাদে ‘আদালতের নিষেধাজ্ঞা ও হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ আড়াল করা হয়েছে’ বাদীপক্ষের ভাষ্য, প্রকাশিত প্রতিবেদনে মামলার বিবাদী এমদাদুল হক, জামবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. আব্দুস সামাদ এবং স্থানীয় বাসিন্দা মাহফুজুর রহমান জুয়েলের বক্তব্য তুলে ধরা হলেও, সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি নিয়ে আদালতে চলমান মামলার আদেশসমূহের পূর্ণাঙ্গ প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়নি। তারা প্রকাশিত সংবাদকে ‘মিথ্যা, ভিত্তিহীন, বানোয়াট ও মানহানিকর’ বলে দাবি করেছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করা বীবাদী পক্ষ গণমাধ্যমকে দায়ী করছেন। যে সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ-আন্দিপুর মৌজার আর.এস ১২২ ও ১২৩ নম্বর খতিয়ানের ২একর ৯৭ শতাংস তফসিলভুক্ত সম্পত্তি ও আমবাগান নিয়ে ভোলাহাট সিভিল জজ আদালতে ৪৬/২০২৩ নম্বর দেওয়ানি মামলা চলমান রয়েছে। মামলাটির বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষই সম্পত্তির দখল, আমবাগানের ব্যবস্থাপনা ও আম সংগ্রহ নিয়ে পরস্পরবিরোধী দাবি করে আসছেন বলে জানা গেছে। বাদীপক্ষের দাবি, মামলার বিচারাধীন সম্পত্তির আমবাগানে বিবাদীপক্ষের প্রবেশ, বাগানের ডালপালা কাটা, কোনো ধরনের ক্ষতিসাধন এবং আম পাড়া বন্ধে আদালতের হস্তক্ষেপ চেয়ে তারা দেওয়ানি কার্যবিধির Order XXXIX Rule 1 and 2 এবং Section 151-এর অধীনে আবেদন করেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের উপস্থিতিতে গত ২৩ মে ২০২৬ তারিখে ভোলাহাট সিভিল জজ আদালত বিবাদীদের আমবাগানে প্রবেশ, ডালপালা কাটা, ক্ষতিসাধন ও আম পাড়া থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন বলে বাদীপক্ষ জানিয়েছে।
তাদের দাবি, ওই নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ এখনো বহাল রয়েছে। পরে আদালতের দ্বারস্থ বিবাদীপক্ষ-বাদীপক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী এবং আদালতের আদেশ মোতাবেক ২৩ মে’র/২০২৬ আদেশের বিরুদ্ধে সরাসরি কোনো পদক্ষেপ না নিয়ে মামলার ১ থেকে ৫ নম্বর বিবাদীপক্ষ দেওয়ানি কার্যবিধির Order XL Rule 1-এর অধীনে গত ২২ জুন ২০২৬ তারিখে আদালতে আবেদন করেন। ওই আবেদনের ওপর ২৫ জুন/২০২৬ শুনানি শেষে মামলার তফসিলভুক্ত সম্পত্তির আমবাগান সুরক্ষা, আয়-ব্যয়ের হিসাব সংরক্ষণ এবং সম্পত্তি বেহাত হওয়া ঠেকাতে মামলা নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভোলাহাট উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে (ইউএনও) রিসিভার হিসেবে নিয়োগের আদেশ দেন ভোলাহাট সিভিল জজ আদালত। আদালতের ওই আদেশ অনুযায়ী, আমবাগানের আম বিক্রয় থেকে প্রাপ্ত অর্থ এবং বাগানের আয়-ব্যয়ের মাসিক হিসাব আদালতে দাখিল করার দায়িত্বও রিসিভারের ওপর দেওয়া হয় বলে বাদীপক্ষের নথিপত্রে উল্লেখ রয়েছে। রিসিভার নিয়োগের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল-২৫ জুনের রিসিভার নিয়োগের আদেশে অসন্তুষ্ট হয়ে মামলার বাদীপক্ষ গত ৫ জুলাই ২০২৬ তারিখে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জজ আদালতে একটি রিভিশান দায়ের করে। রিভিশান নম্বর ১৮/২০২৬। বাদীপক্ষের দাবি, আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত ভোলাহাট সিভিল জজ আদালতের রিসিভার নিয়োগের আদেশ স্থগিত চেয়ে জেলা জজ আদালতেও আবেদন করা হয়। ওই আবেদন শুনানির জন্য আদালত একটি তারিখ নির্ধারণ করেন। এরপর বাদীপক্ষ আমবাগানের আম সুরক্ষা ও বাজারজাতকরণসহ সংশ্লিষ্ট বিষয় বিবেচনায় নিয়ে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হয়। হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন, স্থগিত রিসিভার নিয়োগ-জেলা জজ আদালতে করা স্থগিত আবেদনের বিষয়বস্তু এবং ভোলাহাট সিভিল জজ আদালতের ২৫ জুন/২০২৬ তারিখের রিসিভার নিয়োগের আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে বাদীপক্ষ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগে একটি সিভিল অর্ডার দায়ের করেন। মামলাটির Civil Order No. 2202 of 2026 বলে বাদীপক্ষের নথিতে উল্লেখ রয়েছে। বাদীপক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, হাইকোর্ট বিভাগ গত ১৪ জুলাই ২০২৬ তারিখে বিষয়টি শুনানি শেষে ভোলাহাট সিভিল জজ আদালতের ২৫ জুন ২০২৬ তারিখের রিসিভার নিয়োগের আদেশ স্থগিত করেন। একই সঙ্গে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জজ আদালতকে সংশ্লিষ্ট দেওয়ানি রিভিশন নং ১৮/২৬ বিষয়টি মিস আপীলে রুপান্তর করিয়া নিষ্পত্তির বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয় বলে বাদীপক্ষ জানিয়েছেন। এবং মহামান্য হাই কোর্ট বিভাগের আদেশের জাবেদা মূলে নিশ্চিত করেছেন বাদী পক্ষ। বর্তমানে মামলা টি বিচারাধীন রয়েছে। ফলে ২৫ জুন ভোলাহাট সিভিল জজ আদালতের দেওয়া রিসিভার নিয়োগের আদেশের ওপর হাইকোর্ট বিভাগের স্থগিতাদেশ কার্যকর রয়েছে-এমন দাবি করেছেন মামলার বাদীপক্ষ। মামলার আদেশের জাবেদা কপিতেও বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ‘গুরুত্বপূর্ণ আদালতের আদেশ আড়াল করা হয়েছে’-বাদীপক্ষের অভিযোগ, ২৬জুলাই/২০২৬ বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে দেওয়া তথ্য প্রচারিত সংবাদে আমবাগান ও সম্পত্তি নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ ও বক্তব্য তুলে ধরা হলেও, এর সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ২৩ মে’র নিষেধাজ্ঞার আদেশ, ২৫ জুনের রিসিভার নিয়োগের আদেশ এবং ১৪ জুলাই/২০২৬ তারিখের হাইকোর্ট বিভাগের স্থগিতাদেশের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়নি।এবং বিবাদী পক্ষও বিষয়টি স্টষ্ট করেনি গণমাধ্যকে। বাদী পক্ষের দাবি, একটি বিচারাধীন দেওয়ানি মামলার বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে শুধু এক পক্ষের বক্তব্য নয়, মামলার বর্তমান আইনি অবস্থান, সংশ্লিষ্ট আদালতের আদেশ এবং উচ্চ আদালতের পরবর্তী নির্দেশনাও পাঠকের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। তা না হলে চলমান বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বাদীপক্ষ আরও দাবি করেছে, আদালতের আদেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ দিয়ে সংবাদ প্রচার করা হলে সাধারণ মানুষের কাছে মামলার প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে বিভ্রান্তিকর ধারণা সৃষ্টি হতে পারে।
২৬শে জুলাই/২৬ তারিখে সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞ আদালতের আদেশ গোপন এবং সম্পত্তির অংশ পরিমান বিষয়ে মামলার বিবাদী মোঃ এমদাদুল হকের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আদালতের আদেশ বিষয়ে বাদী পক্ষ ও আমরা বিবাদী পক্ষ সবাই অবগত। ২.৯৭ একর সম্পত্তির মধ্যে আমাদের খরিদ করা ৮৮ শতাংস। বাদী পক্ষের ২ একর ৫ শতাংস। গণমাধ্যমে যদি ভূল তথ্য প্রচার করে থাকে তাহলে সেটার দায়ী আমি বা আমরা নয়। ১৮ জুলাই বাদী পক্ষ ইশতিয়াকের সাথে মোবাইল ফোনে আমি কলদিয়ে কথা বলেছি আপোষ করারা জন্য। বাদী পক্ষ ইশতিয়াক আহমেদ তরুন বলেছে আমাদের উভয় পক্ষের আইনজীবী নিয়ে বসে জমি মাপ যোক করে ভাগ করে নিবো। আমি বলেছিলাম বাদী কে সকালে জানাবো মামা। পরে আর যোগাযোগ করিনি।
২৭শে জুলাই/২৬ তারিখে সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থেকে বিবাদীর প্ররচনা মিথ্যা তথ্য গণমাধ্যমে উপস্থাপন করার বিষয়ে জামবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও আওয়ামীলীগ নেতা মোঃ আব্দুস সামাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমি যা বলেছি বর্তমান অবস্থান থেকে বলেছি। এর বাইরে গণমাধ্যমে যদি ভূল তথ্য প্রচার করে থাকে তাহলে যে গণমাধ্যম প্রচার করেছে সে দায়ী। মোঃ ইসতিয়াক আহমেদ বাদী পক্ষ আরোও জানিয়েছেন, গত ১৮/০৭/২৬ তারিখ রাত্রী অনুমান ৯.৩৭ মিনিটে মামলার বিবাদী মোঃ এমদাদুল হক তার ব্যবহৃত ০১৭১৩-৭০৩০১৮ নং থেকে আমার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নং এ ফোন করেন এবং বলেন যে, যা হয়েছে সব বাদ দাও আমরা আপোশ করি। বিবাদী এমদাদুল কে আমি বলি মামা ভেজালতো আপনি করছেন। আপনি আমাদের কে হাই কোর্ট পর্যন্ত যাইতে বাধ্য করেছেন এবং টাকা খরচ করাচ্ছেন। বিবাদী এমদাদুল আমাকে বলেন মামা সব বাদ দিয়ে আপোশ করা যায় না? আমি বলি কেন আপোশ করা যাবে না? অবশ্যই যাবে। আমি আরোও বলি মামা কাল থেকে বাগানের আম পাড়বো । আপনি আপনার একটা লোক দেন সে আমাদের সাথে থাকবে এবং কতো মন আম পাড়া হলো, কি দামে বাজারে বিক্রি হলো এসব হি সাব রাখবে। আম শেষ করে আপনার এবং আমাদের উকিল সাহেব কে নিয়ে বসে দিন করে মাপ যোক করে নিবো। বিবাদী আমাকে বলেন যে, মামা তোমাকে আমি সকালে জানাচ্ছি। সে আমাকে সকালে জানাবো বলে আর কোন কথা বলেনি বলে জানান মামলার বাদী পক্ষ মোঃ ইসতিয়াক আহমেদ। মামলার বাদীপক্ষ আরও বলছে, তারা আদালতের সব আদেশ ও নথিপত্রের ভিত্তিতেই তাদের বক্তব্য তুলে ধরছে। তাদের উদ্দেশ্য কারও বিরুদ্ধে আদালত বা বিচারিক প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করা নয়; বরং একটি বিচারাধীন মামলার প্রকৃত আইনি অবস্থান জনসম্মুখে স্পষ্ট করা। সংবাদ প্রকাশ নিয়ে প্রশ্ন, আদালতের মর্যাদা রক্ষার আহ্বান-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিচারাধীন কোনো মামলার বিষয়ে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে আদালতের আদেশের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখে তথ্য উপস্থাপন করা জরুরি। বিশেষ করে একই সম্পত্তি নিয়ে একাধিক আদালতে আইনি কার্যক্রম চলমান থাকলে একটি আদেশকে বিচ্ছিন্নভাবে তুলে ধরার পরিবর্তে মামলার ধারাবাহিকতা, পরবর্তী আদেশ ও বর্তমান আইনি অবস্থাও পাঠকের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে বাদীপক্ষের অভিযোগ ও আদালতের আদেশের বিষয়গুলো পৃথকভাবে উপস্থাপন করাই তথ্যভিত্তিক সাংবাদিকতার মূল উদ্দেশ্য। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা-ও সমান গুরুত্বে প্রকাশ করা উচিত। তবে আদালতের আদেশ বা বিচারিক কার্যক্রমকে ঘিরে কোনো পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে আদালতের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে প্রশ্ন তোলা বা আদালতের মর্যাদাহানি হয়—এমন কোনো মন্তব্য করার সুযোগ নেই। চলমান মামলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আদালতের কাছেই ন্যস্ত। ফলে আন্দিপুর মৌজার ওই সম্পত্তি ও আমবাগান নিয়ে বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আদালতের আদেশ ও নির্দেশনা যথাযথভাবে মেনে চলার পাশাপাশি তথ্য প্রকাশে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বাদীপক্ষ। আইনজীবীদের মতে, কোনো সম্পত্তি নিয়ে দেওয়ানি মামলা বিচারাধীন থাকা অবস্থায় সংশ্লিষ্ট সম্পত্তির ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞা বা অন্য কোনো অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ থাকলে, সেই আদেশের কার্যকারিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরবর্তী সময়ে উচ্চ আদালত কোনো আদেশ স্থগিত, সংশোধন বা বহাল রাখলে মামলার বর্তমান অবস্থান নির্ধারণে সেই আদেশও বিবেচ্য হয়ে ওঠে।