পোরশার গাংগুরিয়া-ছাওড় ভূমি অফিসে ‘দালালচক্রের দাপট’! সেবা পেতে হয়রানি-ঘুষ দাবির অভিযোগ
নওগাঁর পোরশা উপজেলার গাংগুরিয়া-ছাওড় ইউনিয়ন ভূমি অফিসে সরকারি ভূমিসেবা নিতে গিয়ে হয়রানি, ঘুষ দাবি, দালাল নির্ভরতা, সাধারণ মানুষের সঙ্গে অসদাচরণ এবং অফিসের কার্যক্রমে অনিয়মের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ওই ইউনিয়ন ভূমি অফিসের ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মো. ফরহাদ শাহ। অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে নওগাঁ অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) বরাবর লিখিত অভিযোগ করেছেন ভূক্তভোগী মো. রফিকুল ইসলাম। অভিযোগের অনুলিপি অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) রাজশাহী, জেলা প্রশাসক নওগাঁ, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পোরশা এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি), পোরশাকে দেওয়া হয়েছে। লিখিত অভিযোগে বলা হয়েছে, গাংগুরিয়া বাজারের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত গাংগুরিয়া-ছাওড় ইউনিয়ন ভূমি অফিসটি উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের মানুষের ভূমিসেবা গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। প্রতিদিন বিভিন্ন দুর-দুরান্ত থেকে মানুষ নামজারি, খতিয়ান, হোল্ডিং, ভূমি উন্নয়ন করসহ নানা কাজে সেখানে আসেন।
কিন্তু অভিযোগকারীর দাবি, একটি কথিত ‘শক্তিশালী দালাল সিন্ডিকেট’ সক্রিয় থাকায় সাধারণ মানুষ সরাসরি ভূমিসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ‘দালাল ছাড়া সেবা মেলে না’ অভিযোগ-অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে, ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষ সরাসরি সেবা নিতে গেলে নানা ধরনের জটিলতা ও হয়রানির মুখে পড়েন। অন্যদিকে দালালদের মাধ্যমে গেলে কাজ সহজে হয়ে যায়। অভিযোগকারীর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় প্রভাবশালী একটি মহলকে ঘিরে অফিস কেন্দ্রিক একটি দালালচক্র গড়ে উঠেছে। ওই চক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন ভূমিসেবা দেওয়ার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, অফিসের আশপাশে কয়েকজন কথিত দালাল নিয়মিত অবস্থান করেন এবং তাদের মাধ্যমে বিভিন্ন কাজ করানোর জন্য সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করা হয়। ফলে সরকারি অফিসে নাগরিকের সরাসরি সেবা পাওয়ার অধিকার প্রশ্নের মুখে পড়ছে। ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ, ‘মক্কেল’ সামলান দালালরা-লিখিত অভিযোগে ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মো. ফরহাদ শাহের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ভূমিসেবা নিয়ে অর্থ দাবির অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, নামজারি, খতিয়ান সংশোধনসহ বিভিন্ন কাজে দালালদের মাধ্যমে টাকা লেনদেনের ব্যবস্থা করা হয়। অভিযোগে একটি ঘটনায় দাবি করা হয়েছে, একজন সেবা গ্রহীতার কাছ থেকে নামজারি মামলা পাস করানোর কথা বলে ১০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। পরে ওই টাকা ফেরত দেওয়ার চেষ্টা এবং এ নিয়ে অভিযোগ ওঠার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। ‘টাকা না দিলে ফাইল আটকে থাকে’-অভিযোগপত্রে আরও দাবি করা হয়েছে, নির্ধারিত সরকারি ফি ও নিয়মের বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয় এবং অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে নানা অজুহাতে কাজ বিলম্বিত করা হয়। কখনো টাকা ছাড়া খারিজের প্রস্তাব না পাঠানো, আবার কখনো ভুল প্রস্তাব পাঠিয়ে মামলা বাতিল হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করার মতো অভিযোগও আনা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, এসব কারণে ভূমি অফিসে আসা সাধারণ মানুষ একদিকে যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে একটি কাজের জন্য বারবার অফিসে এসে সময়, অর্থ ও শ্রম নষ্ট করতে বাধ্য হচ্ছেন। অভিযোগে ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মো. ফরহাদ শাহের নিয়মিত অফিসে উপস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, অফিসে সেবা প্রত্যাশীরা অপেক্ষা করলেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা অনেক সময় অফিসে অনুপস্থিত থাকেন অথবা ব্যক্তিগত কাজে ব্যস্ত থাকেন। এতে সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়া, অফিসে কর্মরত এক নারী সহকারীকে নিয়েও অভিযোগপত্রে বিভিন্ন অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগকারীর দাবি, ওই কর্মীকে দিয়ে নিয়মিত সেবা কার্যক্রম পরিচালনা না করে, দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারসহ বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকার অভিযোগ রয়েছে। লিখিত অভিযোগে ফরহাদ শাহের পূর্ববর্তী কর্মস্থলের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। দীর্ঘ চাকরি জীবনে তিনি পোরশাসহ বিভিন্ন ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুযোগ নিয়ে প্রভাব বিস্তার করেছেন। অভিযোগে আরও দাবি করা হয়, স্থানীয় রাজনীতিক ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে সাধারণ মানুষ তার বিরুদ্ধে অভিযোগ করতেও ভয় পান। অভিযোগকারী এসব কর্মকাণ্ডের তদন্ত করে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভূক্তভোগী। অভিযুক্ত কর্মকর্তার কথিত অনিয়মের বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য, নথি, অডিও ও ভিডিও প্রমাণ অভিযোগকারীদের কাছে রয়েছে বলে জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সেসব যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। অভিযোগকারী মো. রফিকুল ইসলাম দাবি করেছেন, গাংগুরিয়া-ছাওড় ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে দালালমুক্ত করে সাধারণ মানুষের জন্য উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ সেবাকেন্দ্রে পরিণত করতে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে দ্রুত ওই অফিস থেকে বদলি করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। ভূমি অফিসে নাগরিক সেবা নিশ্চিত করা সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। নামজারি, খতিয়ান, ভূমি উন্নয়ন কর কিংবা অন্যান্য ভূমিসেবা পেতে কোনো নাগরিককে দালালের দ্বারস্থ হতে হবে? এমন পরিস্থিতি সরকারি সেবার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার জন্য উদ্বেগজনক। গাংগুরিয়া-ছাওড় ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা জনসম্মুখে আনার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সচেতন মহল। এ বিষয়ে ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মো. ফরহাদ শাহের সাথে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাঁর কর্মরত পরিচয় নিশ্চিত করেন। প্রতিবেদকের পরিচয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া মাত্রই মোবাইল ফোন কেটেন এবং পরবর্তীতে আবারো যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি আর মোবাইল ফোন রিসিভ না করে প্রতিবেদকের মোবাইল কেটে দেন। নওগাঁ জেলার বাংলাদেশ ভূমি অফিসার্স কল্যাণ সমিতির সভাপতি মৌদুদুর রহমান কল্লোল বলেন, বর্তমানে ভূমি সংক্রান্ত প্রায় সকল সেবা ডিজিটাল পদ্ধতির মাধ্যমে। কোন অনিয়ম করার সুযোগ নাই। তার মধ্যেও যদি কেউ অনিয়ম করে থাকে, তাহলে তার দায় এ্যাসোসিয়েশন নিবে না। যে অনিয়ম করবে, দায় তাঁকেই নিতে হবে বলে জানান মৌদুদুর রহমান কল্লোল। ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা মো. ফরহাদ শাহের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগের বিষয়ে নওগাঁ জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) জান্নাত আরা তিথির সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।