শুক্রবার, আগস্ট ২৮, ২০২৭
আখক্ষেত থেকে মরদেহ উদ্ধার-৩ জন গ্রেফতার

অটোরিকশার লোভে চালক রুমন’কে হত্যা! পুলিশ সুপারের সংবাদ সম্মেলন

নিজস্ব প্রতিনিধি ২৭ আগস্ট ২০২৬ ০৬:২১ অপরাহ্ন চাঁপাইনবাবগঞ্জ
নিজস্ব প্রতিনিধি ২৭ আগস্ট ২০২৬ ০৬:২১ অপরাহ্ন
অটোরিকশার লোভে চালক রুমন’কে হত্যা! পুলিশ সুপারের সংবাদ সম্মেলন

একটি অটোরিকশা-মূল্য মাত্র এক লাখ ২০ হাজার টাকা। সেই অটোরিকশার লোভেই হত্যার অভিযোগ, কেড়ে নেওয়া হলো ২৩ বছরের এক তরুণ চালকের প্রাণ। ভোরে জীবিকার সন্ধানে ঘর থেকে বেরিয়ে আর ফেরা হলো না রুমন আলীর। অপেক্ষায় ছিলেন স্বজনরা, হয়তো একটু পরেই ফিরে আসবেন তিনি। কিন্তু সেই অপেক্ষার অবসান হলো পাঁচ দিন পর-শিবগঞ্জ উপজেলার পুটিমারী বিলের একটি আখক্ষেত থেকে উদ্ধার করা হলো তাঁর গলিত মরদেহ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে অটোরিকশা ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে চালক রুমন আলীকে (২৩) হত্যার অভিযোগে তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনার পাঁচ দিন পর স্থানীয়দের সহায়তায় পুটিমারী বিলের আখক্ষেত থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের কাছ থেকে নিহতের অটোরিকশা, হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বলে ধারণা করা ধারালো অস্ত্র, মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগষ্ট) দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস। পুলিশ সুপার জানান, নিহত রুমন আলী পেশায় একজন অটোরিকশাচালক।


গত ২১ আগস্ট ২০২৬, ভোর আনুমানিক সাড়ে ৫টার দিকে তিনি শিবগঞ্জ উপজেলার মোহনবাগ এলাকার নিজ বাড়ি থেকে অটোরিকশা নিয়ে বের হন। কিন্তু দিনের পর দিন পেরিয়ে গেলেও আর বাড়ি ফেরেননি তিনি। স্বজনরা সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর কোনো সন্ধান পাননি। শেষ পর্যন্ত পরদিন ২২ আগস্ট রাত ১২টা ৫ মিনিটে রুমনের স্বজনরা শিবগঞ্জ থানায় তাঁর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে একটি সাধারণ ডায়েরি করেন। জিডি নম্বর ১১৯০। নিখোঁজ তরুণকে খুঁজে বের করতে শুরু হয় পুলিশের অনুসন্ধান। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা তখনও হয়তো ভাবেননি, যে মানুষটিকে তারা জীবিত অবস্থায় খুঁজছেন, পাঁচ দিন পর তাঁর মরদেহ শনাক্ত করতে হবে পোশাক, বেল্ট, স্যান্ডেল আর মোবাইল ফোন দেখে। সিসিটিভি ফুটেজে শুরু রহস্যের জট খুলতে নিখোঁজের ঘটনাটির তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় শিবগঞ্জ থানার এস.আই (নিঃ) সৌরভ কুমার দত্তকে। তদন্তে নেমে পুলিশ বিভিন্ন সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এবং ঘটনাস্থল ও আশপাশের এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা শুরু করে। তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ ও প্রযুক্তিগত অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতায় তদন্তে নতুন মোড় আসে। গত ২৩ আগস্ট প্রথমে মো. ওয়াসিম ওরফে অসিমকে (৩০) আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একই দিন মো. রফিকুল আলমকে (৩৪) আটক করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর তথ্য। পুলিশের দাবি, নিখোঁজ রুমন আলীর অটোরিকশাটিই ছিল অভিযুক্তদের মূল লক্ষ্য। পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস জানান, অভিযুক্তরা রুমনের অটোরিকশাটির মূল্য নির্ধারণ করেছিল প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। পরে সেটি ৭০ হাজার টাকায় মো. উমর ফারুকের কাছে বিক্রি করা হয় বলে তদন্তে তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযুক্তদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ উমর ফারুকের কাছ থেকে রুমনের ব্যবহৃত অটোরিকশাটি উদ্ধার করে। পুলিশ পরে উমর ফারুককেও আটক করে। অটোরিকশা উদ্ধারের পর নিহতের স্ত্রী মোছা. নাজমা সুলতানার লিখিত এজাহারের ভিত্তিতে শিবগঞ্জ থানায় মামলা দায়ের করা হয়। গত ২৩ আগস্ট দায়ের করা ওই মামলায় প্রথমে দণ্ডবিধির ৩৬৪, ৩৭৯, ৪১১ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়। মামলার তদন্তের স্বার্থে গ্রেপ্তার তিনজনকে বিজ্ঞ আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে তিন দিনের পুলিশ রিমান্ডে নেওয়া হয়। জেলা পুলিশের সরাসরি তত্ত্বাবধান ও দিকনির্দেশনায় ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনে একাধিক তদন্ত দল কাজ শুরু করে। রিমান্ডে থাকা আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে নিখোঁজ রুমন আলীকে হত্যা এবং তাঁর অটোরিকশা নিয়ে যাওয়ার বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায় বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার। পুলিশ সুপার আরও বলেন, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে ওয়াসিম ওরফে অসিম রুমন আলীকে হত্যার ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন এবং মরদেহের অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দেন। আসামি ওয়াসিম ওরফে অসিমকে সঙ্গে নিয়ে তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালায় পুলিশ। অবশেষে গত ২৬ আগস্ট বিকেল ৫টা ৪৫ মিনিটের দিকে, স্থানীয় জনগণের সহায়তায় শিবগঞ্জ উপজেলার পুটিমারী বিলের একটি আখক্ষেত থেকে রুমন আলীর গলিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। পাঁচ দিন ধরে নিখোঁজ থাকার কারণে মরদেহে পচন ধরেছিল বলে সংবাদ সম্মেলনে জানান পুলিশ সুপার। প্যান্ট, বেল্ট, স্যান্ডেল ও মোবাইল দেখে শনাক্ত স্বামীর মরদেহ সবচেয়ে হৃদয়বিদারক মুহূর্ত তৈরি হয় মরদেহ শনাক্তের সময়। নিহতের স্ত্রী নাজমা সুলতানা মরদেহের পরনের প্যান্ট, বেল্ট, এক পায়ের স্যান্ডেল এবং মরদেহের সঙ্গে থাকা মোবাইল ফোন দেখে সেটি তাঁর স্বামী রুমন আলীর মরদেহ হিসেবে শনাক্ত করেন। যে মানুষটি কয়েক দিন আগে জীবিকার তাগিদে অটোরিকশা নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়েছিলেন, সেই মানুষটিকেই শেষ পর্যন্ত স্ত্রীকে শনাক্ত করতে হলো গলিত মরদেহের সঙ্গে থাকা ব্যবহৃত সামগ্রী দেখে।


ঘটনাটি এলাকায় শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। উদ্ধার হলো ধারালো অস্ত্রসহ একাধিক আলামত-পুলিশের অভিযানে ঘটনাসংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ আলামত উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে-নিহত রুমন আলীর ব্যবহৃত অটোরিকশা, কাঠের বাটযুক্ত একটি ধারালো ছোট কাস্তে বা হাসুয়া,নিহতের পরনের এক জোড়া সাদা-কালো স্যান্ডেল,মরদেহ উদ্ধারের স্থান থেকে রক্ত-মাংস মিশ্রিত মাটি,নিহতের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, গ্রেপ্তার আসামিদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন। পুলিশের ধারণা, উদ্ধার করা এসব আলামত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রয়োজনীয় ফরেনসিক ও অন্যান্য পরীক্ষার মাধ্যমে আলামতগুলোর সঙ্গে ঘটনার সম্পর্ক যাচাই করা হবে। মরদেহ উদ্ধারের পর মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই (নিঃ) সৌরভ কুমার দত্ত সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে রুমন আলীর মরদেহ চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনসহ তদন্তে পাওয়া অন্যান্য তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে মামলায় প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। গ্রেপ্তার আসামিরা হচ্ছে, শিবগঞ্জের সেলিমাবাদ খানপাড়ার মনিরুল খানের ছেলে মো. ওয়াসিম ওরফে অসিম (৩০), বিশ্বনাথপুরের মৃত নুরুল ইসলামের ছেলে মো. রফিকুল আলম (৩৪) এবং বাগদূর্গাপুর কলকলিয়া এলাকার আতাউর রহমানের ছেলে মো. উমর ফারুক (২৯)। এ ঘটনায় পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারকৃতরা হচ্ছে, মো. ওয়াসিম ওরফে অসিম (৩০), মো. রফিকুল আলম (৩৪) ও মো. উমর ফারুক (২৯)। পুলিশ সুপারের ভাষ্য অনুযায়ী, অটোরিকশা ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে এক তরুণ চালককে হত্যার অভিযোগে ঘটনাটি এখন হত্যা মামলার তদন্তের দিকে এগোচ্ছে। প্রথমে একজন তরুণ অটোরিকশাচালকের নিখোঁজ হওয়া। এরপর তাঁর অটোরিকশা উদ্ধারের সূত্র। সিসিটিভি ফুটেজ, তথ্য-উপাত্ত, জিজ্ঞাসাবাদ ও রিমান্ডে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে একে একে খুলতে থাকে ঘটনার জট। শেষ পর্যন্ত পুটিমারী বিলের আখক্ষেত থেকে উদ্ধার হয় রুমন আলীর গলিত মরদেহ। পাঁচ দিন ধরে স্বজনদের অপেক্ষার অবসান ঘটলেও ফিরে আসেননি রুমন-ফিরেছে শুধু তাঁর নিথর দেহ। জীবিকার জন্য অটোরিকশা চালিয়ে সংসারের স্বপ্ন বুনছিলেন ২৩ বছরের এই তরুণ। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, সেই অটোরিকশার লোভই কেড়ে নিল তাঁর জীবন। একটি যানবাহন ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ থেকে যে হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে, তা এখন শিবগঞ্জজুড়ে তৈরি করেছে শোক, ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন। পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস জানান, মামলার তদন্ত এখনো চলমান। তদন্ত শেষে হত্যাকাণ্ডে জড়িত প্রত্যেকের ভূমিকা এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র আরও স্পষ্ট হবে। সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোঃ একরামুল হক, ডিবি ওসি মোঃ ওবাইদুল ইসলাম, শিবগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ মতিউর রহমানসহ পুলিশের বিভিন্নস্তরের কর্মকর্তা।